সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষার জন্য গত ১ জুন থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। কাগজ-কলমে এই নিষেধাজ্ঞা বলপ্রয়োগ করা হলেও, বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বৈধ পাশধারী জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল এবং পর্যটকদের জন্য বনের দুয়ার বন্ধ থাকলেও, একশ্রেণীর অসাধু চক্রের সহায়তায় দেদারসে চলছে অবৈধ অনুপ্রবেশ। ফলে একদিকে যেমন বনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন সুন্দরবন-নির্ভর সাধারণ মানুষ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
নিষেধাজ্ঞার আড়ালে অবৈধ প্রবেশ: আটক ১১ মৌয়াল
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলেছে গত শুক্রবার সকালেই। গহিন সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের টেংরাখালী বন টহল ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযান চালিয়ে এক হাজার কেজি (১ টন) মধু ও দুটি নৌকাসহ ১১ জন মৌয়ালকে আটক করেছে।
আটককৃত মৌয়ালদের বিস্ফোরক দাবি—তারা বন বিভাগের দালাল হিসেবে পরিচিত জালাল মোল্লার মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করে বনে প্রবেশ করেছিলেন। ১ জুন থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই ‘বিশেষ চুক্তির’ জোরেই তারা মধু সংগ্রহ করতে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের ভেতরের কারো না কারো পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে গহিন বনে প্রবেশ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সাধারণ বনজীবীদের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা
এই অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিয়ম মেনে চলা সাধারণ বনজীবীরা। কৈখালী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"এভাবে অবৈধ পন্থায় মৌসুমি মৌয়ালরা যদি নিষিদ্ধ সময়েই সব মধু নিয়ে যায়, তবে ৩ মাস পর আমরা বৈধ পাশ নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে কী পাবো?"
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া জেলে জামাল হোসেনের কণ্ঠে ঝরে পড়লো হতাশা। তিনি বলেন, “তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য পাস বন্ধ করে দেওয়া মানে আমাদের মতো গরিব জেলেদের পেটে লাথি মারা। অথচ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অবৈধভাবে ঠিকই একদল লোক বনে ঢুকছে।”
বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় উপকূলের অনেক মৌয়াল ও জেলেকে এখন চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলছে।
স্থবির পর্যটন খাত, নষ্ট হচ্ছে নৌযান
টানা তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা লেগেছে সুন্দরবনের পর্যটন খাতেও। মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের টুরিস্ট গাইড আনিসুর রহমান জানান, এই তিন মাস কোনো পর্যটক না থাকায় তারা পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন।
শুধু গাইডরাই নন, চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন ট্রলার ও বোট মালিকরা। নীলডুমুর এলাকার পর্যটকবাহী ট্রলার মাঝি রিপন গাজী জানান, দীর্ঘদিন বোটগুলো অলস বসে থাকার কারণে নোনা পোকা ধরে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
"নিষেধাজ্ঞার সুফল পাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু লোক"
সুন্দরবন ভ্রমণে আসা পর্যটক সালাহউদ্দিন বাপ্পি এই নিষেধাজ্ঞার বর্তমান রূপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, যথাযথ তদারকি ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন:
"প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষার নামে যখন নিষেধাজ্ঞা চলে, তখনই পর্দার আড়ালে বৃক্ষ নিধন, বন্য প্রাণী হত্যা, অভয়ারণ্যে মৎস্য শিকার আর মধু সংগ্রহের উৎসব চলে। এই নিষেধাজ্ঞার সুফল কেবল মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলই পায়। এদের আইনের আওতায় না আনলে নিষেধাজ্ঞা শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াবে।"
সমাধান কোথায়?
উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের সুরক্ষায় নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন থাকলেও তা যেন কেবল সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। চোরা শিকারী ও অসাধু চক্রকে কঠোর হস্তে দমন করার পাশাপাশি, এই তিন মাস সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জন্য সরকার থেকে যে সহায়তা দেওয়া হয় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বনজীবীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা: সুফল পাচ্ছে ‘স্বার্থান্বেষী মহল’, বিপাকে সাধারণ বনজীবী ও পর্যটন খাত
সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা: সুফল পাচ্ছে ‘স্বার্থান্বেষী মহল’, বিপাকে সাধারণ বনজীবী ও পর্যটন খাত
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষার জন্য গত ১ জুন থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। কাগজ-কলমে এই নিষেধাজ্ঞা বলপ্রয়োগ করা হলেও, বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বৈধ পাশধারী জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল এবং পর্যটকদের জন্য বনের দুয়ার বন্ধ থাকলেও, একশ্রেণীর অসাধু চক্রের সহায়তায় দেদারসে চলছে অবৈধ অনুপ্রবেশ। ফলে একদিকে যেমন বনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন সুন্দরবন-নির্ভর সাধারণ মানুষ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। নিষেধাজ্ঞার আড়ালে অবৈধ প্রবেশ: আটক ১১ মৌয়ালনিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলেছে গত শুক্রবার সকালেই। গহিন সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের টেংরাখালী বন টহল ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযান চালিয়ে এক হাজার কেজি (১ টন) মধু ও দুটি নৌকাসহ ১১ জন মৌয়ালকে আটক করেছে। আটককৃত মৌয়ালদের বিস্ফোরক দাবি—তারা বন বিভাগের দালাল হিসেবে পরিচিত জালাল মোল্লার মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করে বনে প্রবেশ করেছিলেন। ১ জুন থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই ‘বিশেষ চুক্তির’ জোরেই তারা মধু সংগ্রহ করতে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের ভেতরের কারো না কারো পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে
গহিন বনে প্রবেশ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাধারণ বনজীবীদের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তাএই অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিয়ম মেনে চলা সাধারণ বনজীবীরা। কৈখালী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:"এভাবে অবৈধ পন্থায় মৌসুমি মৌয়ালরা যদি নিষিদ্ধ সময়েই সব মধু নিয়ে যায়, তবে ৩ মাস পর আমরা বৈধ পাশ নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে কী পাবো?" বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া জেলে জামাল হোসেনের কণ্ঠে ঝরে পড়লো হতাশা। তিনি বলেন, “তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য পাস বন্ধ করে দেওয়া মানে আমাদের মতো গরিব জেলেদের পেটে লাথি মারা। অথচ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অবৈধভাবে ঠিকই একদল লোক বনে ঢুকছে।” বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় উপকূলের অনেক মৌয়াল ও জেলেকে এখন চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলছে। স্থবির পর্যটন খাত, নষ্ট হচ্ছে নৌযানটানা তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা লেগেছে সুন্দরবনের পর্যটন খাতেও। মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের টুরিস্ট গাইড আনিসুর রহমান জানান, এই তিন মাস কোনো পর্যটক না থাকায় তারা পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন। শুধু গাইডরাই নন, চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন ট্রলার ও বোট মালিকরা। নীলডুমুর এলাকার
পর্যটকবাহী ট্রলার মাঝি রিপন গাজী জানান, দীর্ঘদিন বোটগুলো অলস বসে থাকার কারণে নোনা পোকা ধরে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। "নিষেধাজ্ঞার সুফল পাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু লোক"সুন্দরবন ভ্রমণে আসা পর্যটক সালাহউদ্দিন বাপ্পি এই নিষেধাজ্ঞার বর্তমান রূপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, যথাযথ তদারকি ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন: "প্রাণী বৈচিত্র্য রক্ষার নামে যখন নিষেধাজ্ঞা চলে, তখনই পর্দার আড়ালে বৃক্ষ নিধন, বন্য প্রাণী হত্যা, অভয়ারণ্যে মৎস্য শিকার আর মধু সংগ্রহের উৎসব চলে। এই নিষেধাজ্ঞার সুফল কেবল মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলই পায়। এদের আইনের আওতায় না আনলে নিষেধাজ্ঞা শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াবে।" সমাধান কোথায়?উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের সুরক্ষায় নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন থাকলেও তা যেন কেবল সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। চোরা শিকারী ও অসাধু চক্রকে কঠোর হস্তে দমন করার পাশাপাশি, এই তিন মাস সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জন্য সরকার থেকে যে সহায়তা দেওয়া হয় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। বনজীবীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদক: খন্দকার আমিনুর রহমান
[email protected] | ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
গভ: জি: নং-সি-১৩১৫৯৬
প্রধান কার্যালয়: ৩০৬/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী ঢাকা ১২০৪/
50/F,Inner Circular Road,Naya Paltan, Dhaka, 1000
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত